আরোআল কুরআনআল হাদীসইসলামইসলামের পরিচয়

প্রতিক্ষিত সুর্যোদয় : আখেরাত ও জান্নাত

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মূল: শায়েখ আলী তানতাবী
ভাষান্তর: ছাকিবুল ইসলাম কাসেমী

আমি শৈশবেই পড়াশোনা শুরু করেছি ৷ অনেক উস্তাদগণের কাছে গিয়েছি ৷ তখনই বিষয়টি শুনেছিলাম, আমাদের দুই কাঁধে দুইজন ফেরেশতা আছেন ৷ এরা ভালমন্দ সব লিখে রাখেন ৷ কথা কাজ সব লিপিবদ্ধ করেন ৷ তখন একটু থমকে যেতাম ৷ এতো দ্রুত সব লিখে কিভাবে? অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সব ছোট বড় কাজ যেমন: বলা, শুনা, দেখা, ধরা, করা, ভাবা– সবই কিভাবে টুকে রাখেন? এতো দ্রুত কিভাবে সব সম্পন্ন করেন ফেরেশতারা? এসব নিয়ে ছোট্ট চিন্তার অন্তহীন পথে ছুটে যেতাম ৷

তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল ৷ বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে নানা দেশীয় উস্তাদগণের আগমন ঘটতে থাকে আমাদের অঞ্চলে ৷ তারা বর্ণিল ভাষা ও অনুভূতি দিয়ে আমাদেরকে দীনের মর্ম বোঝানোর চেষ্টা করতেন ৷ গুরূত্বপূর্ণ ভাবনার বিষয়গুলোকে খুব সহজবোদ্ধ ভাবে উপস্থাপন করতেন ৷ একদিন এক উস্তাদ বলছিলেন, يوم تشهد عليهم ألسنتهم و أيديهم وأرجلهم بما كانوا يعملون
সেদিন তাদের হাত পা ও মুখ তাদের কৃতকর্মের সাক্ষী দিবে ৷ (নূর/২৪)
আমি ভাবতাম, কিভাবে হাত কথা বলবে, পা কথা বলবে, যবান কিভাবে সাক্ষী দিবে? বুঝে আসতো না বিষয়টি ৷ কিছুটা বড় হলাম ৷ আধুনিক আবিষ্কারের জগত সামনে আসতে লাগল ৷ নানান বৈজ্ঞানিক সৃষ্টি বিশ্বকে সমৃদ্ধ করতে শুরু করল ৷ অনেক অসাধ্য সাধন হয়ে গেল ৷ অনেক অজানা বিষয়ও জানা হয়ে গেল ৷ ফোন কথা বলছে ৷ রেডিও কথা বলছে ৷ টেলিভিশন কথা বলছে ৷ প্রাণহীণ নির্বাক যন্ত্র সরব হয় উঠছে পৃথিবীর অলিতে গলিতে ৷ তাহলে যে মালিক পৃথিবীতে সব জিনিস কে কথা বলাচ্ছেন, সবাক করে তুলছেন, তিনিই আখেরাতে হাত পা কে কথা বলার যোগ্য করে তুলবেন–এতে বিস্ময়ের কিছু নেই ৷ قالوا أنطقنا الله الذي أنطق كل شيء যে মহান স্বত্বা প্রতিটি বস্তুকে কথা বলাচ্ছেন, তিনিই আমাদেরকে কথা বলার শক্তি দিয়েছেন ৷
(ফুস্সিলাত/২৪)
এভাবে বিষয়টি সহজেই বোধগম্য হতে লাগল ৷ তাই আমি বলি, আধুনিক সৃষ্টিজগত ও বৈজ্ঞানিক বর্ণিল আবিষ্কারের মধ্যেও যদি কেউ গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, তাহলেও সে তার ঈমানকে আরও মজবুত ও শক্তিশালী করে তুলতে পারবে ৷ তার দীনি জীবনের অনেক পাথেয় অর্জন করতে পারবে ৷

বিশ্বাস ও ভালবাসার মালঞ্চ

অনেকেই আধুনিক আবিষ্কারকে এভাবে ভাবতে চায় না কিংবা ভাবতে পারে না ৷ তাই এসবের ইতিবাচক শিক্ষা থেকে তারা উপকৃতও হতে পারে না ৷ আবার কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন, যারা আধ্যাত্মিক ও আত্বকেন্দ্রিক বিষয়কে মানতে চাননা ৷ কারণ, এসব তারা দেখেন না ৷ কিন্তু আমি বলি, যে বুদ্ধি দিয়ে তারা এই ভুল সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে,তারা কী তাদের সেই বুদ্ধির সাক্ষাতই কখনো পেয়েছে? নিজ চোখে এই মহান বস্তুর দর্শন লাভে ধন্য হতে পেরেছে ৷ বুঝতে পেরেছে তা কী লাল? সবুজ? না হলুদ? গোল না লম্বা? চিকন না মোটা? শক্ত না নরম? না কিছুই জানেনা ! জানতে পারবেও না ৷ তবুও বিশ্বাস করতে হয় ৷ মেনে নিতে হয় ৷ অদেখা বুদ্ধির এই ঘোড়াতে চড়েই সব আবর্জনা বকতে হয় ৷ কেননা মানুষের জ্ঞান যে সীমিত ৷ অল্প ৷ পৃথিবীর অন্য সব বিষয়ের মতো এটাও সিমান্ত প্রাচীরে আবদ্ধ! وما أوتيتم من العلم إلا قليلا
তোমাদেরকে অল্প জ্ঞানই দান করা হয়েছে ৷ (ইসরা /৮৫)

চূঢ়ান্ত কথা হলো, পৃথিবী তার সব আয়োজনসহ জন্ম লগ্ন থেকেই সীমাবদ্ধ ৷ সংকুচিত ও সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে ধাবিত ৷ অজানা মহা জগতের কতো অল্পই আমরা জেনেছি ৷
يوم تبدل الأرض غير الأرض والسماوات
ভূমির এই পরিবর্তন, আকাশের এই পরিবর্তন কেমন হবে? কতটুকো হবে? মানুষ কতটুকো আর জানতে পারবে? অনুমান করতে পারবে?
তাই প্রতিবন্ধী জ্ঞানের এই নড়বড়ে ভেলায় চড়ে অর্থহীন আস্ফালন করা যাবে না ৷ শুধু বিশ্বাসের নিরাপদ ভূমিতে প্রশান্ত বিচরণ অব্যহত রাখতে হবে ৷
আবার অনেক সাধারণ মানুষ পৃথিবীজুড়ে ঈমানের উপকরণ খুঁজে বেড়ায় ৷ ছোট বড় অনেক ঘটনা থেকে ঈমান কে সুদৃঢ় করার প্রয়াস পায় ৷ চিন্তার সারল্যে বা অপরিপক্কতায় আবার কখনও কোন বিষয়ের শুদ্ধ মর্ম আড়ালেই থেকে যায় ৷

আগুন-কণ্যার গল্প

রিয়াদের এক ঘটনা শুনিয়েছে এক ভাই ৷ একটি মেয়ে নামাজ পড়তো না ৷ শরয়ী কোন বিধানের তোয়াক্কা করতো না ৷ সে হঠাৎ মারা যায় ৷ পরিবার তাকে দাফন করে নিকটস্থ এক শক্ত জমিনে ৷ অল্প কিছুদিনের ব্যবধানেই পাথুরে ভূমির ওই কবরটি থেকে পাথর সরে যায় ৷ কবরটি খুলে যায় ৷ কবর থেকে তারা আগুনের শিখার মত একটা কিছু বেরোচ্ছে দেখতে পায় ৷ তারা খুব ভয় পেয়ে যায় ৷ ভাবে এটা জাহান্নামের আগুন ৷ আখেরাতের শাস্তির দহন ৷ হতেও পারে ৷ আল্লাহ তার কুদরতের কারিশমা দেখিয়ে দেন কখনও ৷ বান্দাদের সাবধান করেন ৷ কিন্তু আমার মনে হয় এটা দুনিয়ার আগুন ৷ কিংবা পারলৌকিক শাস্তির ইহলৌকিক সংস্করণ ৷ লাশ ঠিক আছে ৷ বোধহীন পড়ে আছে ৷ যেমনটি দুনিয়ার আগুনের ক্ষেত্রে হয় ৷ কোন ঘরে আগুন লাগলে, ভিতরে কোন মানুষ থাকলে, ব্যাস পুড়ে যায় ৷ জলসে যায় ৷ মরে যায় ৷ অত:পর গল্প শেষ ৷ তার মধ্যে, তার চামড়া ও দেহের মধ্যে আর কোন বোধ থাকে না ৷ কিন্তু আখেরাতের আগুন! তা কেমন হবে? কতো ভয়ঙ্কর হবে? كلما نضجت جلودهم بدلناهم جلودا غيرها ليذوقوا العذاب তাদের চামড়াগুলো যখন জ্বলে-পুড়ে যাবে, তখন আমি আবার তা পাল্টে দিব অন্য চামড়া দিয়ে, যেন তারা শাস্তি আস্বাদন করতে পারে ৷ ( নিসা/৫৬)
কুরআনের মর্ম ভেদের জগত থেকে " চামড়ার আস্বাদন " বিষয়টি নিয়ে ভাবা যেতে পারে ৷ স্বাদ আস্বাদনের জন্য চামড়া পরিবর্তনের ধারাবাহিকতার ভয়াবহতা নিয়েও চিন্তা করা যেতে পারে ৷ আখেরাতের আগুনতো এক সাক্ষাত অভিষাপ ৷ এক লোমহর্ষক আখ্যান ৷ ওখানে পানি থাকবে ৷ ويسقي من ماء صديد তাতে পুঁজ মেশানো পানি পান করানো হবে ৷ (ইবরাহিম/১৬)
ওখানে গাছ থাকবে, لآكلون من شجر من زقوم তোমরা অবশ্যয়ই ভক্ষণ করবে যাক্কুম ( কাটাদার ) বৃক্ষ থেকে ৷(ওয়াকিয়া/৫২)
আর দুনিয়ার আগুনতো নেয়ামত ৷ আল্লাহর অগণিত নেয়ামতের এটিও একটি ৷ এটি একটি রহমত ৷ আগুন দিয়ে খাবার রান্না করি ৷ প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরী করি ৷ মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় সব উপকরণের জন্যই আগুন অপরিহার্য ৷ জীবন আগুনহীন থেমে যায় ৷ তাই এটি রহমত ৷ ওটি গজব ৷ হ্যাঁ, তবে যদি আগুনকে কেউ অশুদ্ধ ও ধ্বংসের জন্য ব্যবহার করে তবে সে আপদ তার উপরই বর্তাবে ৷

প্রস্তুতির প্রহর প্রিয় !

কিন্তু সেই জাহান্নামে জ্বলবে কারা? যারা হাসি-খেলার জীবনকে আপন করে নিয়েছিল ৷ প্রস্তুতির পৃথিবীকে চূঢ়ান্ত গন্তব্য বানিয়ে রেখেছিল ৷ হৃদয়কে পাথর বানিয়ে নিয়েছিল ৷ বিগলিত করেনি প্রভুর জন্য ৷ তার দয়ার সরোবরে অবগাহনের জন্য ৷
আমি জানি আমিও শুদ্ধ নই ৷ নেককার বাধ্য গোলাম নই ৷ আমার মনেও পাপ দানা বাঁধে ৷ আমার হৃদয়েও গাফলত চলে আসে ৷ আল্লাহ যদি মনকে একটু কোমল করে দিতেন ! তাকওয়ার আলোতে ধন্য করে দিতেন ৷
ভাবি, নইলে কিভাবে সইব সেই ভয়াবহ আগুন ৷ অথচ দুনিয়ার সাধারণ আগুনকেও সইবার ক্ষমতা রাখি না ৷ নিচে আগুন জ্বালিয়ে অনেক উপরে একটি লোহা রাখলেও তা যেভাবে লাল আগুন হয়ে যায় ! তাতে বোঝা যায় এতো উপরেও একটু বসতে পারবো না! জ্বলে যাব ৷ পুড়ে যাব! তাহলে সত্তোর গুণ অধিক তপ্ত সেই জাহান্নামের আগুনের ভিতরে কিভাবে অবস্থান করব ! অল্প সময়ের জন্যওতো সম্ভব নয়!
এদিকে সে জগতের সময়ও হাজার বছর গুণ বড় ৷
إن يوما عند ربك كألف سنة مما تعدون
তোমার রবের কাছের একদিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান হবে ৷ তাহলে যদি তিন দিনও আগুনে জ্বলতে হয়, তার মানে হযরত ঈসা আ. এর জমানা থেকে নিয়ে এপর্যন্ত সময়ের পরিমাণ আগুনে জ্বলতে হবে ৷ সময়ের বিষয়টাও বড় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার! সুস্থ মানুষ মানেই এই সুকঠিন মসিবত থেকে বাঁচার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবে ৷

তাই প্রিয় শ্রোতাদের কাছে গভীর ভালবাসার সাথে অনুরোধ করছি, প্রথমতো আমিই আত্মশুদ্ধির বড় কাঙ্গাল! তাকওয়া ও পরহেজগারীর বেশী মুহতাজ ৷ আল্লাহ যেন আমাকে ইসলাহ ও শুদ্ধি দান করেন ৷ সকলকেই তাকওয়ার নেয়ামত দানে ধন্য করেন ৷ চলুন, আল্লাহর কাছে অশ্রুসজল চোখে ক্ষমা চাই ৷ তার দয়া ভিক্ষা চাই ৷ তার দরবারে আশ্রয় চাই ৷ পাথেয় অর্জনের এই নশ্বর পৃথিবীকে জীবনের অভিষ্ট লক্ষ্য না বানাই ৷ এব্যাপারেও করুণাময় প্রভুর সাহায্য চাই ৷

Facebook Comments

Leave a Reply