তালাকপরিবার পরামর্শস্বামী-স্ত্রী

পারিবারিক সমস্যা : অধিক হারে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ ও প্রতিকার

কেন আমাদের সমাজে সংসারগুলো টিকছে না? বিশ্বাসগুলো কেন স্থায়ী হচ্ছে না?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইসলামে বিবাহ একটি ইবাদত। সাধারণ কোন ইবদত নয়। বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সুন্নত। ইসলাম মানুষকে বিবাহের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। বিবাহকে করেছে সহজ। একটি বৈবাহিক সম্পর্ক সর্বদা টিকে থাকুক এটি ইসলাম চায়। বৈবাহিক বন্ধনকে ইসলামে “মীসাকে গালীজ” তথা ‘সুদৃঢ় সম্পর্ক বা প্রতিশ্রুতি’ বলা হয়েছে। [সূরা নিসা : ২১] যেন যে কোন মূল্যে এ সম্পর্ক টিকে থাকে। বন্ধন অটুট হয়। উভয় পক্ষকে ইসলাম বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা, দীক্ষা ও পরামর্শ দিয়েছে। দায়িত্ব ও উপদেশ দিয়েছে। সুসংবাদ দিয়েছে। দাম্পত্য জীবনে সুখের নিশ্চয়তা দিয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে- “আর আল্লাহ তায়ালার নিদর্শনসমূহ থেকে তিনি তোমাদের জন্য স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পার এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করে দিয়েছেন।” [সূরা রূম : ২১]

আরো ইরশাদ হচ্ছে- “তোমাদের সঙ্গীহীন ও সৎকর্ম পরায়ণ দাস-দাসীদের বিবাহ করিয়ে দাও। তারা দরিদ্র হলে আল্লাহ আপন অনুগ্রহে তাদেরকে সম্পদশালী করে দিবেন।” [সূরা নূর : ৩২]

আল্লাহ তায়ালা এই দুই আয়াতে দম্পতিদের মাঝে ভালবাসা ও আর্থিক সচ্ছলতা দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যাতে সংসার গুলো টিকে থাকে। বন্ধনগুলো স্থায়ী হয়। সম্পর্কগুলো গাঢ় হয়।

কিন্তু এরপরও কেন আমাদের সমাজে সংসারগুলো টিকছে না? বিশ্বাসগুলো কেন স্থায়ী হচ্ছে না? পারিবারিক বন্ধনগুলো কেন সামান্যতেই ঠুনকো হয়ে যাচ্ছে দিন দিন? কেন ভয়ানক হারে বেড়ে চলছে বিবাহ বিচ্ছেদের ট্রাজেডি? প্রবন্ধে এর কিছু কারণ ও সমাধন নিয়ে আলোচনার প্রয়াস পাব।

এক. মৌলিকভাবে ধর্মীয় অনুশাসন ও সুশিক্ষার অনুপস্থিতি বা অভাব।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ এটি। ধর্মীয় অনুশাসনের অধ্যায়টি অনেক বিস্তৃত-ছড়ানো। যার শুরু বিশ্বাস ও মূল্যবোধ দ্বারা। এরপর জীবন-দর্শন ও জীবনধারা, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক, একে অপরের হক সম্পর্কে সচেতনতা, বিনয় ও ছাড়ের মানসিকতা- এই সবই ধর্মীয় অনুশাসনের আওতাভুক্ত। এমনিভাবে পর্দা-পুশিদা রক্ষা, পরপুরুষ বা পরনারীর সাথে সম্পর্ক ও মেলামেশা থেকে বিরত থাকা ইত্যাদিও বিশেষ ধর্মীয় অনুশাসন। এসব পালন না করাও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অবনতি ও বিবাহ বিচ্ছেদের উল্লেখযোগ্য কারণ।

ইসলামী শিক্ষায় পারস্পরিক হক রক্ষার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরকে কোনোভাবে-ই কষ্ট না দেওয়া, প্রত্যেকে অন্যের হক রক্ষায় সচেষ্ট থাকা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। ইসলাম শুধু অধিকারের কথা বলে না, কর্তব্যের কথাও বলে। স্বামী ও স্ত্রী প্রত্যেকেরই রয়েছে কর্তব্য এবং অধিকার। নিজের কর্তব্য পালন আর অন্যের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হলেই সবার শান্তি আসতে পারে।

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- “আর স্ত্রীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের প্রতি (স্বামীদের) অধিকার রয়েছে।” [সূরা বাকারা : ২২৮]

দুই. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে ব্যাপক হারে ভুল করা।

পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে ব্যাপক হারে ভুল করা হয়। আর সে ভুলের মাশুল দিতে হয় বিবাহ বিচ্ছেদের মাধ্যমে। হাজারো চেষ্টা করেও পরবর্তিতে এ সম্পর্ক টেকসই হয় না। দীনদ্বারী বা ধর্ম পরায়ণতা হল খোদা ভীরুতা ও তাকওয়ার সাধারণ স্তর। তাই প্রতিটি মুমিনের মধ্যে এগুণ থাকা অপরিহার্য। নারীদের যাবতীয় গুণের মঝে এটি একটি আবশ্যকীয় গুণ। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে-

হযরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “সাধারণত চারটি কারণে নারীদেরকে বিবাহ করা হয়। অর্থের কারণে। বংশীয় মর্যাদার কারণে। রূপের কারণে। ধর্ম পরায়নতার কারণে। সুতরাং তুমি দ্বীনদ্বার নারী বিবাহ করে সফল হও। তুমি ধন্য হবে।” [সহীহ বুখারী :৪৮০২; সহীহ মুসলিম :১৪৬৬]

হযরত আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন

“যখন তোমাদের কাছে এমন কেউ বিয়ের প্রস্তাব প্রেরণ করে যার দ্বীনদ্বারী ও চারিত্রিক বিষয়ে তোমরা খোশ, তাহলে তাকে বিয়ে করাও (তোমাদের সন্তানের সাথে)। যদি এমনটি না কর, তবে যমিনে সৃষ্টি হবে বিশৃঙ্খলা ও ব্যাপক বিপর্যয়।” [জামে তিরমিযী : ১০৬৬, ১০০৫]

এ হাদীসে দ্বীনদ্বারী প্রাধান্য দেওয়ার জন্য রাসূল সা. আমাদেরকে বিশেষভাবে ওসিয়ত করেছেন। কেবল আর্থিক অবস্থান বা বাহ্যিক রূপ-গুণ দেখেই পাত্র-পাত্রী নর্বাচন শুদ্ধ নয়। যার ফলে পরবর্তিতে এ সংসার টেকসই হয় না। সুখের হয় না। আমাদের সমাজে এবিষয়টি বিশেষভাবে উপেক্ষিত। দ্বীনদ্বারী প্রধান্য দেওয়ার মানসিকতা ও বাস্তবতা আমাদের সমাজে খুবই কম।

একজন প্রকৃত দ্বীনদার সে ধৈর্যসম্পন্ন হয়। সে ধৈর্য ধারণ করে। এ শিক্ষা সে দ্বীন থেকে গ্রহণ করে। আর দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি ধাপ পার করতে হয় ধৈর্য নামক সিড়ি দিয়ে। সাধারণত দ্বীনদার না হলে ধৈর্য থেকে বঞ্চিত হতে হয়। অল্পতেই অস্থির ও নিরাশ হয়ে পড়ে, যা ইসলামী রুচি ও শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে।

প্রসঙ্গত : ছেলে-মেয়ে নিজেরাই পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করা বোকামো। মুরুব্বিদের মত বাস্তব অভিজ্ঞতা তো আর তরুণদের থাকে না। তাদের আছে, আবেগ, কাঁচা বুদ্ধি ও তাড়না। এসবের সাথে কোন সিদ্ধান্তই সুন্দর ও সঠিক হতে পারে না। তাই তাদের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে ভুল হয়। মুরুব্বিদের পরামর্শ ও দ্বীনদারী প্রাধান্য দিয়ে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করতে হবে।

তিন. তালাকের অপব্যবহার।

বিবাহের বন্ধন তো অনেক শক্ত অনেক মজবুত। তাই সাধারণ কারনে তালক নয়। পূর্ব ব্যবস্থা গ্রহণ করে ব্যর্থ হলে, কোন আলেমের সাথে পরামর্শ করে তালাক প্রয়োগ করতে হয়। শরীয়তের নির্দেশনা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত বৈবাহিক সম্পর্ক রক্ষায় প্রয়াসী হওয়ার। তালাক ও বিবাহ-বিচ্ছেদের পর্যায়টি হচ্ছে সর্বশেষ পর্যায়, যা একান্ত অনিবার্য প্রয়োজনের স্বার্থেই বৈধ করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য হতে পারে, ঝগড়া-বিবাদ হতে পারে, তা নিজেরাই মিটমাট করে নেয়া চাই। যদি তা বড় আকার ধারণ করার আশংঙ্কা হয় তখন দুই পরিবার আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করবে। শালিশ-সমঝোতাসহ যাবতীয় পূর্ব-পদক্ষেপ বিফল হয়ে গেলে যদি তালাকের পথে যেতেই হয় তবে কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিয়ে তালাক দিবে। এক পবিত্র পিরিয়ড পার হয়ে পরবর্তি পবিত্র পিরিয়ডে সর্বোচ্চ প্রত্যাহর যোগ্য এক তালাক দিবে।

তালাক তো এক দম চূড়ান্ত পর্যায়। তার পূর্বে অনেক ধাপ আছে। সাধরণ কারণে তালকের সিদ্ধান্ত নেয়া বোকামী ও কুরাআন-সুন্নাহ পরি-পন্থি। এমনিভাবে কথায় কথায় তালাকের আলোচনা করা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট করে। স্ত্রী মাঝে মাঝে বললেও আপনি সাবধান হোন।

চার .তালাকের মত গুরু দায়িত্ব নারীদের হাতে প্রদান করা।

তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ একটি স্পর্শকাতর বিষয়। কেবলমাত্র বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যবহার করার অস্ত্র। অনেক ক্ষেত্রেই একবার হাত থেকে বেরিয়ে গেলে ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে না। এর সিদ্ধান্ত ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে, খুব ভেবে চিন্তে গ্রহণ করতে হয়। যা সাধারণত নরীদের কাজ নয়। তাই মৌলিকভাবে এ দায়িত্ব ইসলাম পুরুষকে দিয়েছে। যাতে বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।

যখনই দায়িত্বের এ বোঝা নারীর কাঁধে তুলে দেওয়া হল, শুরু হয়ে গেল এর অপপ্রয়োগ ও অপব্যবহার। জরিপে প্রকাশ : বিবাহ বিচ্ছেদে ৭২% নারীদের পক্ষ থেকে। তাই তালাকের অধিকার পুরুষের হাতে ন্যস্ত করার যথার্থতাও স্পষ্ট হচ্ছে। ইসলামী বিধানে তালাকের অধিকার পুরুষের হাতে ন্যস্ত করার পাশাপাশি পুরুষকে যে সকল গুণের অধিকারী হওয়ার এবং স্ত্রী ও পরিবার পরিচালনায় যে নীতি ও বিধান অনুসরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা পালনের মাধ্যমে কাঙ্খিত সুফল পাওয়া সম্ভব। ইসলাম স্ত্রীদেরকে ‘খোলা‘আ’র অধিকার দিয়েছে এবং স্বামী থেকে পাওয়া অধিকার বলে তালাকেরও ক্ষমতা দিয়েছে, যা আমাদের দেশের কাবিননামার ১৮ নং ধারায় উল্লেখ থাকে। সে ধারার গলদ ব্যবহার করেই নারীগণ পুরুষের চেয়ে ৩ গুণ বেশি তালাকের পথে হাঁটছে। এর থেকেই অনুমান করা যায় যে, যদি তারা সরাসরি তালাকের ক্ষমতা পেত তবে পরিস্থিতি আরো কত ভয়াবহ হতো।

পাঁচ. অধিক পরিমাণে অপরাধ ও গুণাহ করা, গুনাহে লিপ্ত থাকা।

যেখানে আল্লাহর অবাধ্যতা সেখানে শান্তি নেই। আল্লাহ শান্তি তুলে নেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই নানা রকম হারাম কাজে লিপ্ত। স্বামী পর নারীদের দেখে স্বাদ নেয়- অনলাইনে-অফলাইনে, পত্রিকা-ম্যাগাজিনে। এটি সব ক্ষেত্রেই অপরাধ। সমান পাপ। এবং পরিণাম ও ভয়াবহতার দিক থেকেও সমান। তিনি অন্য মেয়েদের দেখেন। পাপ করেন। ফলে তিনি আসল সুখ ও মজা থেকে বঞ্চিত হন।

স্ত্রী ব্যাক্তির জান্নাত। দুনিয়ার উপভোগের সর্বোৎকৃষ্ট বস্তু। যখনই তিনি হালাল রেখে হারামের পথে পা বাড়ান, আল্লাহ তাকে জান্নাতের এ সুখ ও মজা থেকে বঞ্চিত করেন। কারণ তিনি তার সুখের জন্য ভিন্ন রাস্তা অবলম্বন করেছেন।

অপর দিকে তার স্ত্রীও একই পথে। তিনি পরপরুষের জন্য সাজ-গোজ করেন। তাদের সামনে নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ করাসহ অনেক হারাম ও নাজায়েয কাজ করেন। হারামে আরাম থাকে না। হারাম বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে সুখ উঠে যাচ্ছে। পারিবারিক শান্তি হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবার ভেঙ্গে যাচ্ছে।

এছাড়াও ঘর-বাড়িতে রহমত প্রবেশের সকল দরজা বন্ধ। সহীহ বুখারীতে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, “ছবি বা কুকুর যে ঘরে থাকে তাতে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” [সাহীহ বুখারী :৩২২৬] শোভা বর্ধনের নামে মূর্তি, পুতুল ঘরে প্রবেশ করার কারণে রহমতের ফেরেশতা ঘরে প্রবেশ করছে না। তাই অশান্তি আসছে।

পারিবারিক শান্তির জন্য শুধু পরিবারকেন্দ্রিক ইসলামী অনুশাসনগুলোই নয়, সাধারণ অনুশাসনগুলো মেনে চলাও জরুরী। যেমন ধরুন, মাদকাসক্তিও অনেক পরিবারের ভাঙ্গনের কারণ। মাদক ইসলামী বিধানে হারাম। এটি দাম্পত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় নয়, সাধারণ বিষয়। কিন্তু এর প্রভাব পারিবারিক জীবনেও পড়ে এবং প্রকটভাবেই পড়ে।

ছয়. স্বামী অথবা স্বামীর পরিবারের পক্ষ থেকে কঠোরতা ও জুলুম করা।

অনেক ক্ষেত্রে এটিই বিবাহ বিচ্ছেদের বড় কারণ হিসেবে দেখা যায়। স্বামী বা স্বামীর আত্মীয়রা অবিচার করে বধুর প্রতি। স্বামী মনে করে আমি নেতা। সে চাকরানি। কী নির্বোধ! আপনি যদি তাকে চাকরানি মনে করেন তাহলে তো আপনি চাকরানির স্বামী। আর যদি রাণী ভাবেন তাহলে তো আপনি রাজা! এটি ভুল চিন্তা।

স্ত্রী একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। তার ভুল ত্রুটি হতেই পারে। তাকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। ইসলাম এটিই বলে। ইসলামে নারীর মর্যাদা বেশি। বাবার চেয়ে মায়ের মর্যাদা বেশি। কন্যা সন্তানদেরকে রাসূল সা বেশি ভালবাসতেন। রাসূলের সর্বশেষ অসিয়তেও নারীদের বিষয় ছিল। রাসূল সা. বলেন, “তোমরা নারীদের ক্ষেত্রে আমার পক্ষ থেকে কল্যাণের অসিয়ত গ্রহণ কর।” [সহীহ বুকারী : ৩৩৩১]

সব কিছু ছেড়ে একটি মেয়ে আপনার ঘরে আপনার কাছে আসে। আপনার জন্য তার সব কিছু সে বিসর্জন দেয়। কত অসহায় সে তখন। আন্তরিকতার প্রয়োজন। সুতরাং কঠোরতা পরিহার করুন। স্বামী ও স্বামীর পরিবারের সকলেই। অনেক ক্ষেত্রেই এদের কারণে সম্পর্কে এত ত্ক্তিতা তৈরী হয়ে যা বিবাহ বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়। এটি মারাত্মক জুলুম। অনেক ইবাদতকারী হয়ে ধরা খেয়ে যাবেন অনেকে এর কারণে। শারীরিক মানসিক কোন নির্যাতন করা যাবেনা।

ইরশাদ হচ্ছে, “নারীদের সাথে তোমরা উত্তম উপায়ে জীবন যাপন কর। যদি তাদের কোন কিছু তোমাদরে অপছন্দ হয় তবে (শুনে নাও) হতে পারে তোমরা কোন বিষয় অপছন্দ করলে আর আল্লাহ তাতে তোমাদের জন্য অনেক কল্যাণ রেখেছেন।” [সূরা নিসা : ১৯]

কোন কাজ, কথা বা আচরণ অপছন্দের হলে এ আয়াত স্মরণ করুন। এতে আল্লাহ কল্যাণ দিবেন। হাদীস শরীফে এসেছে, নবী কারীম সা. বলেন, “কোন মুমিন অন্য মুমিন নারী (পুরুষ) -কে চূড়ান্তভাবে ঘৃণা করতে পারে না। তার একটি স্বভাবে সন্তুষ্ট না হলে অন্য স্বভাবে অবশ্যই সন্তুষ্ট হবে।” [সহীহ মুসলিম : ২৬৭২] সুতারাং কোন কারণে মন মালিন্য হলে, গোস্বা আসলে আপনার সঙ্গীর ভাল স্বভাব ও আচরণগুলো স্বরণ করুন। প্রত্যেকের মাঝেই অবশ্যই অনেক ভাল স্বভাব, গুণ আছে। ইনশাআল্লাহ বন্ধন মজবুত হবে। সম্পর্ক অটুট হবে।

ঝগড়া মিটানোর জন্য নরম হয়ে যান। চুপ থাকুন। প্রতিবাদ করা থেকে বিরত থাকুন। ভুল স্বীকার করুন। সে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে তারপর তাকে বুঝান। সে মেনে নিবে। পলিসি অনুসরণ করুন। সুখী হোন।

সাত. যৌতুক একটি সামাজি ব্যাধি।

বিবাহ বিচ্ছেদের কারণগুলোর মধ্যে আরো যে কারণটির কথা উল্লেখ করা যায় তা হলো যৌতুক। যৌতুকের কারণে কত সংসার যে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে তার কোন হিসাব নেই। অনেক কন্যা দায়গ্রস্থ পিতা-মাতা যৌতুক প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কন্যাকে বিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু পরবর্তীতে যারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যৌতুক প্রদান করতে পারেনি তাদের কন্যারা ঐসব যৌতুক লোভী স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হন।

শশুর বাড়ি থেকে দেয়া-নেয়া নিয়ে আমাদের সমাজে অনেকেই ছোটলোকি করেন। কষ্ট করে একটি মেয়েকে লালন করে বিয়ে দেয়। কত কষ্ট! সংসারে আপনার স্ত্রী একজন বুয়ার চেয়ে বেশি সার্ভিস দিচ্ছে। সন্তান দিচ্ছে। আপনাকে গুনাহ থেকে বাঁচাচ্ছে। তার পুরো জীবনটিই আপনার করে দিল। এরপরও আরো চাহিদা?? আপনি স্ত্রীর কাছে কিছুই দাবি করতে পারেন না। স্ত্রী-ই আপনার কাছে খাবার দাবারসহ তার প্রয়োজনীয় সব কিছু দাবি করার অধিকার রাখে। এটি ইসলামের বিধান।

যৌতুকের শরঈ বিধান :

ছেলে পক্ষ থেকে মেয়ে পক্ষের কাছ থেকে কোন কিছু তলব করা হয় বা চেয়ে নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ ও ঘুষ। একে দেশীয় ভাষায় যৌতুক বলা হয় । সামাজিক ও ধর্মীয় উভয় দৃষ্টিকোন থেকেই এটা অত্যান্ত নিন্দনীয় ও জঘন্য অপরাধ। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে , নবী কারীম সা.বলেন, ‘‘ কারো জন্য অন্যের সম্পদ তার পূর্ণ মনোতুষ্টি ব্যতিত বৈধ নয়। [মুসনাদে আহমদ : ৫/৪২৫]

আট . তথাকথিত নারীসংগঠন বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম করাণ।

এদের অনেক কর্ম তৎপরতা ভালো। তবে পরিবারিক বন্ধন নষ্ট করা ও বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে এদের ভুমিকা অনেক। এরা নরীদেরকে ভুল বুঝায়। উস্কানি দেয়। গোলামী করবে কেন? নিজের পায়ে দাঁড়াও!প্রচারণায়, পত্রপত্রিকায়, সিনেমায়, নাটকে এবং অনলাইন অফলাইন সব জাগায় তারা নারীদেরকে বিপথগামী করে। বিভিন্ন উস্কানিমূলক শ্লোগান দেয়।

আমাদের সমাজে সাধারণত স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে ভালবাসে। কখনো কিছু টুকটাক হয়ে গেলেও উভয়ে চায়, যেকোন ভাবে সমাধান হোক। কিন্তু এরা নারীদেরকে ফুসলিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ পর্যন্ত নিয়ে পৌঁছায়।

ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়ের দায়িত্ব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের ভরণ-পোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পুরুষের। কাজেই পুরুষ বাইরে উপার্জন করবে আর নারী ঘরে সংসার ও সন্তানদের আদব-তরবিয়ত ও প্রাথমিক লেখাপড়ায় সময় দেবে- মৌলিকভাবে এটাই স্বাভাবিক পদ্ধতি। এর বিপরীতে নারী-স্বাধীনতা বা নারীর স্বাবলম্বিতার নামে নারীকে উপার্জনে বের করার যে সংস্কৃতি এর কুফল ইতোমধ্যে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। খোদ সমাজ-চিন্তকেরাই এখন স্বীকার করছেন যে, বিবাহ-বিচ্ছেদের এক বড় কারণ, নারী বাইরে বের হওয়া এবং পর-পুরুষের সাথে মেলামেশা। অথচ অন্য ক্ষেত্রে নারীর স্বাবলম্বিতার তথা বাইরের জগতে বিচরণের বর্তমান ধারার পক্ষে নারী-নির্যাতনের বিষয়টিকে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে, এর দ্বারা নারী নির্যাতন তো কমছেই না, বরং বাড়ছে, একইসাথে সংসারও ভাঙছে। কাজেই গোড়া থেকেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। একান্ত আর্থিক সমস্যা ছাড়া নারীদেরকে রোজগারের জন্য ঘরের বাইরে বের করবে না, বরং স্বামীরাই স্ত্রী-সন্তানের খরচাদির ব্যবস্থা করবে।

এমনিভাবে নিম্নোক্ত বিষয় গুলোও বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ :

ক. অনেক পরিমাণে উভয় দিকের চাহিদা ও আশা।

খ. প্রযুক্তি, ইন্টারনেট ও মিডিয়ার অপব্যবহার।

গ. অযথা সন্দেহ।

ঘ. দ্রুত বাচ্চা না নেয়া।

ঙ. খুব রাগী হওয়া। ধৈর্য না থাকা।

এভাবে আরো অনেক কারণ আছে। তাই নারী-পুরুষের সকলের উচিত বিবাহ বিচ্ছেদের কারণগুলো চিহ্নিত করে সমঝোতার মাধ্যমে তার সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। কথা আছে, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে।’ একথাটি পুরোপুরি আমি বিশ্বাস করতে পারি না। কারণ সংসার শুধু রমণীর গুণে সুখের হতে পারে না। যদি পুরুষের গুণ না থাকে। তাই আমি মনে করি সংসার সুখের হয় নারী-পুরুষ উভয়ের গুণে। তবে নারীদেরকে একটু বেশী গুণী হওয়া উচিত। তবেই সংসার সুখের হবে।

ধর্মপরায়ণ হতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসনের বাহিরে যে সুখ নেই তা ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে। পাশাপাশি মনে রাখতে হব, সংসার করতে গেলে টুকটাক ঝগড়া ঝাটি হবেই। তবে এই ঝগড়াঝাটিকে সংসারের ভিতরেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। আর কোন বিষয়ে মতনৈক্য দেখা দিলে দু’জনে মিলে সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। তাহলে সংসার সত্যিই সোনার সংসার হিসেবে রূপ নিবে।

দুটি হাদীস :

এক.

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী বর্ণিত হয়েছে যে-

“আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় হালাল হচ্ছে তালাক।” [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২০১৮]এ হাদীস থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে একটি পরিবার ভেঙ্গে যাওয়া, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া আল্লাহ তায়ালার খুব অপছন্দের। বিশেষ প্রয়োজনে, মানুষ যখন নাচার-নিরুপায় হয় তখন কেবল তালাক প্রয়োগ করবে। এটি অনন্যোপায়কালীণ ব্যবস্থা। তাই কারণে অকারণে, সামন্যতেই এর প্রয়োগ আল্লাহ তায়ালার অপছন্দ।

দুই.

হযরত যাবের রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, “ইবলিস তার সিংহাসন পানিতে স্থাপন করে। তারপর তার বাহিনীদের প্রেরণ করে। সর্বোচ্চ দুষ্কৃতিকারী তার সর্বাধিক নৈকট্য লাভ করে। (দুষ্কৃতি শেষে) একজন এসে বলে : আমি এই এই কাজ করেছি। ইবলিস বলে, তুমি উল্লেখযোগ্য কিছুই করোনি! অপর একজন এসে বলে, আমি স্বামীর পিছনে লেগেই ছিলাম। একপর্যায়ে তার ও তার স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাই! তখন শয়তান তাকে কাছে টেনে নেয় আর বলে, হ্যাঁ তুমিই কাজের কাজ করেছ! এবং তার সাথে আলিঙ্গন করে!” [সহীহ মুসলিম :৫০৩৯]

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য শয়তানের সবচে বেশি চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র। এ কর্মে ইবলিস সর্বাধিক খুশী। তাই আমদেরকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

সুখী হোক আপনার পারিবারিক জীবন! সুখী হউন আপনি! সুখী হোক সকলে! সুখী হোক সামজ।

Facebook Comments

Leave a Reply